ভদ্রতার মুখোশে লুকানো ভিক্ষুকেরা — যারা আত্মসম্মান বিক্রি করে সফল হতে চায়



ভদ্রতার মুখোশে লুকানো ভিক্ষুকেরা


কেউ ভিক্ষা করে পেট চালায়, আর কেউ তেলবাজি করে অবস্থান বানায়— বাইরে থেকে দুটো জিনিস আলাদা মনে হলেও ভেতরের সত্যিটা অনেক সময় একই রকম। পার্থক্য শুধু একজন হাতে থালা নিয়ে দাঁড়ায়, আরেকজন নিজের ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মান আর বিবেককে বিক্রি করে দেয় সুবিধার আশায়।

সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যারা যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় কার সামনে কতটা মাথা নত করা যায়। তারা বিশ্বাস করে, সত্য বলার চেয়ে প্রশংসা করা বেশি লাভজনক। তাই তারা নিজের মতামতকে হত্যা করে, অন্যায় দেখেও চুপ থাকে, শুধু একটু সুবিধা পাওয়ার জন্য। ধীরে ধীরে এই অভ্যাস মানুষটাকে ভিতর থেকে ফাঁপা করে দেয়। তখন তার আর আলাদা কোনো পরিচয় থাকে না— সে কেবল ক্ষমতাবান কারও ছায়া হয়ে বেঁচে থাকে।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এদের অনেকেই ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকে। বাইরে থেকে নম্র, মার্জিত আর ভদ্র সেজে থাকলেও ভেতরে ভেতরে তারা অন্যায়কে লালন করে। সুযোগ পেলেই প্রতিহিংসা ছড়ায়, মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, অথচ মুখে নীতিকথা বলতে একটুও ক্লান্ত হয় না। তারা বড় বড় কথা বলে মানবতা নিয়ে, সম্মান নিয়ে, মূল্যবোধ নিয়ে— কিন্তু বাস্তবে অন্য মানুষকে মানুষ বলেই মনে করে না। যাদের দিয়ে নিজের স্বার্থ পূরণ হয় না, তাদের তুচ্ছ ভাবতে এক মুহূর্তও দেরি করে না।

এরা এমন এক ধরনের মানসিক দাসত্বে অভ্যস্ত হয়ে যায় যেখানে সত্য, ন্যায় কিংবা বিবেকের কোনো মূল্য থাকে না। কার সামনে কতটা অভিনয় করা যায়, কতটা সুবিধা আদায় করা যায়— সেটাই হয়ে ওঠে তাদের চরিত্রের মূল ভিত্তি। তাই তাদের হাসিতে আন্তরিকতা থাকে না, কথায় সততা থাকে না, আর সম্পর্কেও থাকে না কোনো মানবিক গভীরতা।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, এই ধরনের মানুষরা অনেক সময় সাময়িক সফলতাও পেয়ে যায়। পদ, ক্ষমতা, অর্থ— সবকিছুই হয়তো পায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে উন্নতির জন্য প্রতিদিন নিজের আত্মসম্মানকে হত্যা করতে হয়, সেটাকে কি সত্যিই উন্নতি বলা যায়? মানুষ যখন নিজের বিবেকের কাছে ছোট হয়ে যায়, তখন বাইরের বড় পরিচয়গুলোও একসময় অর্থহীন লাগে।

আত্মসম্মানহীন সাফল্য খুব চকচকে হতে পারে, কিন্তু তা কখনো সম্মানজনক নয়। কারণ ইতিহাসে টিকে থাকে তারা, যারা মাথা উঁচু করে চলতে শিখেছে; যারা সত্য বলার সাহস রাখে। তেলবাজরা হয়তো সাময়িকভাবে সুবিধা পায়, কিন্তু তাদের কোনো স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি হয় না। তারা সবসময় কারও করুণার উপর নির্ভরশীল থাকে।

একজন প্রকৃত মানুষ কখনো নিজের ব্যক্তিত্বকে বিক্রি করে বাঁচতে চায় না। কারণ সে জানে, ক্ষুধা মানুষকে ছোট করে না— ছোট করে আত্মসম্মানহীন মানসিকতা।

0 comments:

Post a Comment