ত্বকের যত্ন

শীতে ত্বকের যত্ন: স্কিন ব্যারিয়ার ঠিক রাখার সহজ রুটিন

শীতে ত্বকের যত্ন নিয়ে আমরা সাধারণত তখনই ভাবি, যখন সমস্যা চোখে পড়তে শুরু করে। সকালে মুখ ধোয়ার পর গাল টেনে ধরে, নাকের পাশে সাদা খোসা ওঠে, ঠোঁটের কোণ ফেটে যায়। অথচ এর বেশিরভাগই ঠেকানো যায় খুব সাধারণ কয়েকটা অভ্যাসে। দামি পণ্য কেনার আগে বুঝে নেওয়া দরকার, শীতে ত্বকের ভেতরে আসলে কী ঘটে।

শীতে ত্বক কেন এত শুষ্ক হয়ে যায়

কারণটা মূলত বাতাস। শীতে বাতাসে জলীয় বাষ্প কমে যায়, আর শুকনো বাতাস ত্বকের ওপরের স্তর থেকে পানি টেনে নেয়। তার ওপর আমরা এই সময় গরম পানিতে গোসল করি, পানি কম খাই, ঘরে বসে লেপ-কম্বলের নিচে বেশি সময় কাটাই। গরম পানি আরামের হলেও ত্বকের নিজস্ব তেলটুকু ধুয়ে দেয়। ফলে ত্বক নিজের আর্দ্রতা আর ধরে রাখতে পারে না।

শুষ্ক বা সংবেদনশীল ত্বকের মানুষ এই পরিবর্তন সবার আগে টের পান। তবে তৈলাক্ত ত্বকও রেহাই পায় না। অনেকেই অবাক হন যে শীতে তাঁদের কপাল তেলতেলে থাকে, অথচ গাল খসখসে। এর কারণ, তেল আর পানি এক জিনিস নয়। ত্বকে তেল থাকলেও পানির ঘাটতি হতে পারে।

স্কিন ব্যারিয়ার কী, আর কেন এটাই আসল বিষয়

ত্বকের একেবারে বাইরের স্তরটাকে একটা ইটের দেয়াল হিসেবে কল্পনা করুন। কোষগুলো হলো ইট, আর এদের মাঝের সিমেন্ট তৈরি হয় সেরামাইড, কোলেস্টেরল আর ফ্যাটি অ্যাসিড দিয়ে। এই দেয়াল দুটো কাজ করে: ভেতরের পানি বাইরে যেতে দেয় না, আর বাইরের ধুলাবালি ও জীবাণুকে ভেতরে ঢুকতে দেয় না। শীতের শুষ্ক বাতাস আর ভুল অভ্যাসে এই সিমেন্টে ফাটল ধরে। শীতের বেশিরভাগ ত্বকের সমস্যার শুরু এখান থেকেই।

আপনার ব্যারিয়ার দুর্বল হয়েছে কি না, কয়েকটা লক্ষণ দেখে বোঝা যায়:

  • মুখ ধোয়ার কয়েক মিনিট পরেই টানটান বা জ্বালা ভাব
  • গাল, নাকের পাশ বা ভ্রুর আশপাশে খসখসে চামড়া
  • যে ক্রিম আগে দিব্যি সহ্য হতো, এখন তাতে জ্বালা করা
  • হালকা লালচে ভাব, কখনো হঠাৎ ছোট ছোট দানা
  • মেকআপ বসতে না চাওয়া, খোসা খোসা দেখানো

সকালের রুটিন: চারটা ধাপ, পাঁচ মিনিট

  1. হালকা ক্লিনজার: শীতের সকালে ফেনা ওঠা কড়া ফেসওয়াশের দরকার নেই। ক্রিমি বা জেল ধরনের মৃদু ক্লিনজারই যথেষ্ট। ত্বক খুব শুষ্ক হলে সকালে শুধু কুসুম গরম পানি দিয়ে মুখ ধুলেও চলে।
  2. হাইড্রেটিং সিরাম (চাইলে): হায়ালুরোনিক অ্যাসিড বা গ্লিসারিন আছে এমন সিরাম মুখ ধোয়ার পর ত্বক সামান্য ভেজা থাকতেই লাগান। একদম শুকনো ত্বকে লাগালে শুষ্ক বাতাসে এটা উল্টো অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
  3. ময়েশ্চারাইজার: গরমের হালকা জেল এখন তুলে রাখুন। সেরামাইড আছে এমন একটু ঘন ক্রিম বেছে নিন। ত্বক ভেজা থাকা অবস্থায় লাগালে আর্দ্রতা বেশি আটকে থাকে।
  4. সানস্ক্রিন: বাইরে বের হলে অন্তত এসপিএফ ৩০ এবং ব্রড স্পেকট্রাম লেখা সানস্ক্রিন দিন। শীতের নরম রোদ দেখে ভুলবেন না, এ নিয়ে নিচে আলাদা করে বলছি।

রাতের রুটিন: ত্বক মেরামতের সময়

সারা দিনের ধুলা, ঘাম, সানস্ক্রিন আর মেকআপ রাতে ভালোভাবে তুলে ফেলা জরুরি। মেকআপ থাকলে আগে ক্লেনজিং বাম বা মাইসেলার ওয়াটার দিয়ে তুলে নিন, তারপর হালকা ক্লিনজারে মুখ ধুয়ে নিন। এরপর ত্বক পুরোপুরি শুকানোর আগেই ময়েশ্চারাইজার লাগান।

যাঁরা রেটিনল বা এক্সফোলিয়েটিং অ্যাসিড ব্যবহার করেন, শীতে একটু রয়েসয়ে চলুন। প্রতি রাতে না লাগিয়ে সপ্তাহে দুই-তিন রাতে নামিয়ে আনুন। জ্বালা করলে কয়েক দিন পুরো বন্ধ রাখুন, তারপর আবার ধীরে শুরু করুন। নাকের পাশ বা ঠোঁটের কোণের মতো খুব শুষ্ক জায়গায় ময়েশ্চারাইজারের ওপর পাতলা করে পেট্রোলিয়াম জেলি দিলে রাতভর আর্দ্রতা আটকে থাকে।

ত্বকের ধরন অনুযায়ী শীতে ত্বকের যত্ন

শুষ্ক ত্বক

আপনার জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হলো পানি আটকে রাখা। ঘন ক্রিম, সেরামাইড আর রাতে স্লিপিং মাস্ক বা পেট্রোলিয়াম জেলির পাতলা স্তর বেশ কাজে দেয়। দিনে দুবারের বেশি মুখ না ধোয়াই ভালো।

তৈলাক্ত ও ব্রণপ্রবণ ত্বক

শীতে ময়েশ্চারাইজার বাদ দেওয়া সবচেয়ে প্রচলিত ভুল। ত্বক পানি হারালে অনেক সময় আরও বেশি তেল তৈরি করে। হালকা, নন-কমেডোজেনিক লেখা জেল-ক্রিম বেছে নিন, যাতে লোমকূপ বন্ধ না হয়।

মিশ্র ত্বক

পুরো মুখে একই জিনিস লাগাতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। টি-জোনে হালকা ময়েশ্চারাইজার আর গালে একটু ঘন ক্রিম, এভাবে ভাগ করে লাগালে দুই দিকই সামলানো যায়।

সংবেদনশীল ত্বক

সুগন্ধিমুক্ত, কম উপাদানের পণ্য বেছে নিন। একসঙ্গে একাধিক নতুন পণ্য শুরু করবেন না। প্রতিটা নতুন পণ্য কানের পেছনে বা হাতের ভেতরের দিকে অল্প লাগিয়ে এক-দুই দিন প্যাচ টেস্ট করে নিন।

কোন উপাদান খুঁজবেন, কোনগুলো এড়াবেন

সেরামাইড ত্বকের নিজেরই উপাদান, ওই সিমেন্টের বড় অংশ। ময়েশ্চারাইজারে সেরামাইডের সঙ্গে কোলেস্টেরল ও ফ্যাটি অ্যাসিড থাকলে ব্যারিয়ার মেরামতে তা বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে।

নিয়াসিনামাইড হলো ভিটামিন বি৩-এর একটি রূপ। ব্যারিয়ার শক্ত করা, লালচে ভাব কমানো আর তেল নিয়ন্ত্রণে এটি সাহায্য করতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ আছে। কম ঘনত্বের পণ্য দিয়ে শুরু করাই নিরাপদ।

হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ও গ্লিসারিন পানি টেনে ধরে রাখে। তবে এগুলো একা কাজ শেষ করে না, ওপরে ময়েশ্চারাইজার দিয়ে আর্দ্রতা আটকে দিতে হয়।

অন্যদিকে তীব্র সুগন্ধি, অ্যালকোহল-প্রধান টোনার আর ঘন ঘন স্ক্রাব শীতে দুর্বল ত্বকের জন্য ঝামেলা বাড়ায়। এগুলো কিছুদিন সরিয়ে রাখুন।

শীতেও সানস্ক্রিন কেন বাদ দেবেন না

শীতের রোদ গায়ে মিষ্টি লাগে, তাই অনেকেই এ সময় সানস্ক্রিন ছেড়ে দেন। সমস্যা হলো, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির যে অংশটাকে ইউভিএ বলা হয়, তা সারা বছরই থাকে এবং কুয়াশা বা মেঘ ভেদ করেও ত্বকে পৌঁছায়। এই রশ্মি ত্বকের অকাল বার্ধক্য আর দাগ বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত। শুষ্ক ত্বকে ক্রিম বা লোশন ধরনের সানস্ক্রিন সাধারণত বেশি আরাম দেয়। বাইরে লম্বা সময় থাকলে কয়েক ঘণ্টা পরপর আবার লাগানোর অভ্যাস করুন।

ঠোঁট, হাত আর পায়ের দিকেও নজর দিন

শীতে সবার আগে বিপদে পড়ে ঠোঁট। বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজানোর অভ্যাস থাকলে আজই বাদ দিন। লালা শুকিয়ে গিয়ে ঠোঁটকে আরও শুষ্ক করে ফেলে। দিনে কয়েকবার সুগন্ধিমুক্ত লিপ বাম আর রাতে পাতলা করে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগান।

হাত ধোয়ার পর প্রতিবার অল্প হ্যান্ড ক্রিম লাগান, বিশেষ করে যাঁরা রান্না বা ঘরের কাজে বারবার পানি ধরেন। ফাটা গোড়ালির জন্য গোসলের পর পা ভালো করে মুছে ঘন ফুট ক্রিম দিন, তারপর সুতির মোজা পরে ঘুমান। কয়েক রাতেই পার্থক্য চোখে পড়বে।

শীতে যে ভুলগুলো অনেকেই করেন

  • খুব গরম পানিতে লম্বা সময় ধরে গোসল; কুসুম গরম পানি আর অল্প সময়ই যথেষ্ট
  • খোসা উঠছে বলে বারবার স্ক্রাব করা; এতে ব্যারিয়ার আরও দুর্বল হয়
  • তৈলাক্ত ত্বক বলে ময়েশ্চারাইজার পুরো বাদ দেওয়া
  • সামাজিক মাধ্যমে দেখে একসঙ্গে পাঁচটা নতুন পণ্য শুরু করা
  • শীতে তৃষ্ণা কম লাগে বলে পানি কম খাওয়া

শীতে ত্বকের যত্ন নিয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্ন

শীতে দিনে কতবার মুখ ধোয়া উচিত?

বেশিরভাগ মানুষের জন্য সকালে একবার আর রাতে একবার মৃদু ক্লিনজারে মুখ ধোয়াই যথেষ্ট। বারবার ধুলে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল আরও কমে যায়।

শীতে কি সত্যিই সানস্ক্রিন লাগে?

হ্যাঁ। দিনের বেলা বাইরে বের হলে শীতেও সানস্ক্রিন দরকার, কারণ ইউভিএ রশ্মি সারা বছরই থাকে।

তৈলাক্ত ত্বকে শীতে কোন ময়েশ্চারাইজার ভালো?

হালকা জেল বা জেল-ক্রিম টেক্সচারের, নন-কমেডোজেনিক লেখা ময়েশ্চারাইজার বেছে নিন। গ্লিসারিন বা নিয়াসিনামাইড থাকলে বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।

ঘরোয়া উপায়ে কি শীতের শুষ্কতা কমানো যায়?

গোসলের পানি কুসুম গরম রাখা, গোসলের পরপরই শরীরে ময়েশ্চারাইজার বা তেল লাগানো আর পর্যাপ্ত পানি পান করা বেশ কাজে দেয়। তবে মুখে লেবু বা কাঁচা কোনো উপাদান সরাসরি ঘষার আগে সাবধান থাকুন, এগুলো সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালা করতে পারে।

কখন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

দুই-তিন সপ্তাহ নিয়ম মেনে যত্ন নেওয়ার পরেও উন্নতি না হলে, কিংবা তীব্র চুলকানি, ফেটে রক্ত পড়া, পানি বা পুঁজ জমা অথবা ছড়িয়ে পড়া লাল দাগ দেখা দিলে দেরি না করে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান। একজিমা বা সোরিয়াসিসের মতো সমস্যা শীতে বাড়তে পারে, আর সেগুলোর জন্য চিকিৎসকের দেওয়া চিকিৎসাই দরকার। এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।

শেষ কথা

শীতে ত্বকের যত্ন আসলে জটিল কিছু নয়। মৃদুভাবে মুখ পরিষ্কার করুন, ভেজা ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগান, সেরামাইডের মতো ব্যারিয়ার-বান্ধব উপাদান বেছে নিন, আর রোদে বের হলে সানস্ক্রিন ভুলবেন না। শক্তিশালী অ্যাক্টিভ উপাদান কিছুদিন কমিয়ে রাখুন, নতুন পণ্য যোগ করুন ধীরে ধীরে। এই কয়েকটা অভ্যাস নিয়মিত মানলেই পুরো শীত আপনার ত্বক থাকবে নরম আর আরামদায়ক।

Written by a

Comments